অহল্যাবাই হোলকার: জীবন, শাসনব্যবস্থা ও অবদান

অহল্যাবাই হোলকারের জন্ম, বিবাহ, শাসনভার গ্রহণ, প্রশাসনিক দক্ষতা, জনকল্যাণমূলক কাজ, কাশী বিশ্বনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণ এবং ঐতিহাসিক অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।

Table of Contents

রানি অহল্যাবাই হোলকার: জীবন, রাজত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান

ঐতিহাসিক চরিত্রঅহল্যাবাই হোলকার
জন্ম৩১ মে, ১৭২৫ খ্রিস্টাব্দ
জন্মস্থানচৌন্ডি গ্রাম, বর্তমান মহারাষ্ট্র
পিতার নামমানকোজি রাও শিন্ডে
স্বামীর নামখান্ডেরাও হোলকার
পুত্রমালেরাও হোলকার
শাসনভার গ্রহণ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ
প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্রমহেশ্বর
রাজ্যমালব অঞ্চলের হোলকার রাজ্য
প্রধান অবদানসুশাসন, জনকল্যাণ, মন্দির সংস্কার ও বস্ত্রশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা
পরিচিত উপাধিলোকমাতা
মৃত্যু১৩ আগস্ট, ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ

অহল্যাবাই হোলকার: জীবন, শাসনব্যবস্থা ও অবদান

ভূমিকা :- ভারত-এর ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নারী শাসক ছিলেন অহল্যাবাই হোলকার (১৭২৫–১৭৯৫ খ্রি.)। তিনি মারাঠা শক্তির অন্তর্গত মালব অঞ্চলের হোলকার রাজ্যের শাসক হিসেবে দক্ষ প্রশাসন, জনকল্যাণমূলক কাজ, ধর্মীয় স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষকতা এবং শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বামী ও পুত্রের মৃত্যুর পর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শাসনকালে মহেশ্বর প্রশাসন, বস্ত্রশিল্প ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। জনকল্যাণে তাঁর অবদানের জন্য তিনি ‘লোকমাতা’ নামে পরিচিত হন।

অহল্যাবাই হোলকারের জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

রানি অহল্যাবাই হোলকার ১৭২৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে বর্তমান মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলার চৌন্ডি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মানকোজি রাও শিন্ডে। তিনি গ্রামের একজন পাটিল বা গ্রামপ্রধান ছিলেন। অহল্যাবাই সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশীলন ও জনসেবার প্রতি আগ্রহী ছিলেন।

অহল্যাবাই হোলকারের শিক্ষা

সেই সময়ে মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল। কিন্তু তাঁর পিতা তাঁকে পড়তে ও লিখতে শিখিয়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এই শিক্ষা এবং পারিবারিক পরিবেশ তাঁর সহায়ক হয়েছিল।

অহল্যাবাই হোলকারের বিবাহ ও হোলকার পরিবারে প্রবেশ

১৭৩৩ খ্রিস্টাব্দে অহল্যাবাইয়ের বিবাহ হয় মালব অঞ্চলের প্রভাবশালী মারাঠা নেতা মালহার রাও হোলকারের পুত্র খান্ডেরাও হোলকারের সঙ্গে। এই বিবাহের মাধ্যমে তিনি হোলকার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হন।

রাজ্য পরিচালনা সম্পর্কে অহল্যাবাই হোলকারের ধারণা লাভ

মালহার রাও হোলকার তাঁর পুত্রবধূর ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতা উপলব্ধি করে তাঁকে প্রশাসনিক কাজকর্ম সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেন। ফলে অহল্যাবাই রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে থেকেই রাজ্য পরিচালনা, রাজস্ব ব্যবস্থা ও সামরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন।

রাজ্যের কাজে যুক্ত অহল্যাবাই হোলকার

১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে ভরতপুর অঞ্চলের কুম্ভের দুর্গ অবরোধের সময় খান্ডেরাও হোলকারের মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর অহল্যাবাই গভীর শোকের মধ্যে পড়লেও তাঁর শ্বশুর মালহার রাও তাঁকে রাজ্যের কাজে যুক্ত থাকতে উৎসাহিত করেন।

পুত্রের মৃত্যু

অহল্যাবাইয়ের জীবনে ১৭৬৬ ও ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর শ্বশুর মালহার রাও হোলকারের মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর পুত্র মালেরাও হোলকার শাসনভার গ্রহণ করলেও ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁরও মৃত্যু ঘটে।

অহল্যাবাই হোলকারের শাসনক্ষমতা লাভ

পরপর এই মৃত্যুর ফলে হোলকার রাজ্যে নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে অহল্যাবাই রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য পেশোয়ার অনুমতি চান। সমর্থন ও অনুমোদন লাভের পর তিনি ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে শাসনভার গ্রহণ করেন।

গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র মহেশ্বর

তিনি মহেশ্বরকে নিজের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। নর্মদা নদীর তীরে অবস্থিত এই শহর তাঁর শাসনকালে রাজনীতি, শিল্প, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তিনি প্রায় ২৮ বছর, অর্থাৎ ১৭৬৭ থেকে ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজ্য পরিচালনা করেন।

অহল্যাবাই হোলকারের শাসনব্যবস্থা

রানি অহল্যাবাই হোলকারের শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রজাকল্যাণ। তিনি রাজ্য পরিচালনাকে কেবল রাজস্ব সংগ্রহ বা সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন নি; সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানের দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছিলেন। শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল –

  • ১. প্রজাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ :- তিনি নিয়মিত জনসাধারণের অভিযোগ শুনতেন এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন।
  • ২. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা :- প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিতেন।
  • ৩. রাজস্ব ব্যবস্থার পরিচালনা :- কৃষি ও বাণিজ্যের উন্নয়নের জন্য রাজ্যের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ সচল রাখার চেষ্টা করেন।
  • ৪. শান্তি ও নিরাপত্তা :- রাজ্যের অভ্যন্তরে শান্তি বজায় রাখা এবং বহিরাগত আক্রমণের মোকাবিলা করা তাঁর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।
  • ৫. যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব প্রদান :- সামরিক ও প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ব্যবহার করে তিনি রাজ্যের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন।

মালব অঞ্চলে তুলনামূলক শান্তি

তাঁর প্রশাসনিক কার্যকলাপের ফলে মালব অঞ্চলে তুলনামূলক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বজায় ছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়।

সামরিক ক্ষেত্রে অহল্যাবাই হোলকারের অবদান

প্রতিপক্ষের আক্রমণ রোধে উদ্দ্যোগ

অহল্যাবাই হোলকারের পরিচয় শুধু জনকল্যাণমূলক শাসক হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজ্যের নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়েও তিনি সচেতন ছিলেন। হোলকার রাজ্যের সামরিক শক্তি সংগঠিত রাখা এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

সামরিক দায়িত্বে তুকোজি রাও হোলকার

সামরিক পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তিনি তুকোজি রাও হোলকারের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তির হাতে অর্পণ করেন। তুকোজি রাও রাজ্যের সামরিক কার্যকলাপ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর মাধ্যমে অহল্যাবাই প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও সামরিক পরিচালনার মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করেন।

গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সংগঠন

রাজ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং হোলকার পরিবারের ক্ষমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই সামরিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ধর্মীয় ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রেঅহল্যাবাই হোলকারের অবদান

অহল্যাবাই হোলকারের অন্যতম স্মরণীয় অবদান ছিল ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থানে মন্দির নির্মাণ, সংস্কার এবং জনসাধারণের সুবিধার্থে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা। তাঁর এই উদ্যোগ মালব অঞ্চলের বাইরেও বিস্তৃত ছিল।

(ক) কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের পুনর্নির্মাণ

১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে বারাণসীর কাশী বিশ্বনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণের সঙ্গে অহল্যাবাই হোলকারের নাম বিশেষভাবে যুক্ত। মন্দিরটির পুনর্নির্মাণ তাঁর ধর্মীয় স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষকতার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলির একটি।

(খ) সোমনাথ মন্দির

গুজরাটের সোমনাথ অঞ্চলে মন্দির পুনর্নির্মাণ ও ধর্মীয় স্থাপনার উন্নয়নেও তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়। সোমনাথের পুরোনো মন্দিরের সঙ্গে তাঁর নাম বিশেষভাবে জড়িত।

(গ) ঘাট নির্মাণ ও সংস্কার

তীর্থযাত্রীদের সুবিধার জন্য তিনি বিভিন্ন স্থানে নদীর ঘাট নির্মাণ ও সংস্কারের ব্যবস্থা করেন। এসব ঘাট ধর্মীয় কাজের পাশাপাশি স্নান, জল ব্যবহার ও জনসমাগমের সুবিধাও বৃদ্ধি করেছিল।

(ঘ) ধর্মশালা, কূপ ও জলাধার

দূরদূরান্ত থেকে আগত তীর্থযাত্রীদের থাকার জন্য ধর্মশালা নির্মাণ এবং পানীয় জলের জন্য কূপ ও জলাধার তৈরি তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

(ঙ) বিভিন্ন তীর্থস্থানে সহায়তা

কাশী, সোমনাথ, দ্বারকা, হরিদ্বার ও রামেশ্বরমের মতো বিভিন্ন তীর্থস্থানে নির্মাণ, সংস্কার বা ধর্মীয় কার্যকলাপে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর উদ্যোগের ফলে ধর্মীয় স্থাপত্যের পাশাপাশি যাতায়াত ও তীর্থযাত্রার পরিকাঠামোও উপকৃত হয়েছিল।

অহল্যাবাই হোলকারের আমলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন

রানি অহল্যাবাই হোলকারের শাসনকালে মহেশ্বর অর্থনৈতিক কার্যকলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তিনি শিল্পী, কারিগর ও বণিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বাণিজ্য ও উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডের বিকাশে তাঁর উদ্যোগ রাজ্যের অর্থনৈতিক জীবনে প্রভাব ফেলে। কৃষি, বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার ফলে রাজ্যের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ সচল রাখতে সাহায্য হয়।

মহেশ্বরী বস্ত্রশিল্পের বিকাশ

তাঁর অর্থনৈতিক অবদানের উল্লেখযোগ্য দিক হল মহেশ্বরী বস্ত্রশিল্পের বিকাশ। মহেশ্বরের তাঁতশিল্প এবং মহেশ্বরী শাড়ি পরবর্তী সময়ে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। বয়নশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়ার ফলে এই শিল্পের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে।

শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা

  • (১) অহল্যাবাই হোলকার শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশেও আগ্রহী ছিলেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় মহেশ্বর সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা এবং ধর্মীয় আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
  • (২) তিনি কবি, পণ্ডিত, শিল্পী ও কারিগরদের সম্মান করতেন। তাঁদের সৃজনশীল কাজের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেন। এর ফলে মহেশ্বরের সাংস্কৃতিক জীবনে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দেয়।
  • (৩) তাঁর শাসনকালে ধর্মীয় স্থাপনা ও জনকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশও যুক্ত ছিল। এই সমন্বিত পৃষ্ঠপোষকতা তাঁর শাসনকে বিশেষ পরিচিতি দেয়।

অহল্যাবাই হোলকারের সমাজকল্যাণমূলক কাজ

অহল্যাবাই হোলকারের শাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উন্নতি। তিনি ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যবহারিক প্রয়োজনের প্রতিও নজর দিয়েছিলেন। তাঁর সমাজকল্যাণমূলক কাজের উল্লেখযোগ্য দিকগুলি হলো –

  • পথ ও যোগাযোগ :- যাতায়াতের সুবিধার্থে রাস্তা নির্মাণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ।
  • জল সরবরাহ :- বিভিন্ন স্থানে কূপ, জলাধার ও ঘাট নির্মাণ।
  • তীর্থযাত্রীদের সুবিধা :- ধর্মশালা ও বিশ্রামাগার নির্মাণের মাধ্যমে পথিকদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা।
  • কৃষি ও বাণিজ্য :- কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক কার্যকলাপের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা।
  • জনসাধারণের অভিযোগ শোনা :- নিয়মিত জনদরবারের মাধ্যমে প্রজাদের সমস্যার সমাধান করা।

এই কাজগুলি তাঁর রাজ্যের মানুষের জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিশেষত রাস্তা, জলাধার ও ধর্মশালার মতো স্থাপনা দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের উপকারে এসেছিল।

নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অহল্যাবাই হোলকারের গুরুত্ব

  • (১) অষ্টাদশ শতকের ভারতীয় সমাজে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের সুযোগ সীমিত ছিল। এমন পরিস্থিতিতে অহল্যাবাই হোলকার নিজের প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার মাধ্যমে শাসনক্ষমতা পরিচালনা করেন।
  • (২) তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সংকটের মুখে রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। রাজ্যের প্রশাসন, অর্থনীতি, সামরিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা তাঁর নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
  • (৩) তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই কারণেই ভারতীয় ইতিহাসে তিনি একজন স্মরণীয় নারী শাসক হিসেবে পরিচিত।

অহল্যাবাই হোলকারের মৃত্যু

১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দের ১৩ আগস্ট অহল্যাবাই হোলকারের মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৭০ বছর। তাঁর মৃত্যুর পর তুকোজি রাও হোলকার হোলকার রাজ্যের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

রানি অহল্যাবাই হোলকারের অম্লান স্মৃতি

তাঁর মৃত্যুর পরও প্রশাসনিক দক্ষতা, জনকল্যাণমূলক কাজ এবং মন্দির ও অন্যান্য স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তাঁর স্মৃতি অম্লান থাকে। বিশেষত মহেশ্বরের সঙ্গে তাঁর নাম আজও গভীরভাবে যুক্ত।সংহার

উপসংহার :- পরিশেষে বলা যায়, অহল্যাবাই হোলকার ছিলেন অষ্টাদশ শতকের ভারতীয় ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য নারী শাসক। তিনি রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তাঁর জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ, ধর্মীয় স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষকতা, মহেশ্বরের বস্ত্রশিল্পের বিকাশ এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ তাঁকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। তাঁর শাসন ও কর্মজীবন ভারতীয় ইতিহাসে নারী নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণমুখী প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

(FAQ) অহল্যাবাই হোলকার: জীবন, শাসনব্যবস্থা ও অবদান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য ?

১. অহল্যাবাই হোলকার কে ছিলেন?

অহল্যাবাই হোলকার ছিলেন অষ্টাদশ শতকের মালব অঞ্চলের হোলকার রাজ্যের শাসক। তিনি সুশাসন, জনকল্যাণ এবং ধর্মীয় স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য পরিচিত।

২. অহল্যাবাই হোলকার কবে জন্মগ্রহণ করেন?

তিনি ৩১ মে, ১৭২৫ খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রের চৌন্ডি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

৩. অহল্যাবাই হোলকার কত সালে শাসনভার গ্রহণ করেন?

তিনি ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে হোলকার রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন।

৪. অহল্যাবাই হোলকারের রাজধানী কোথায় ছিল?

তাঁর প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল মহেশ্বর, যা বর্তমান মধ্যপ্রদেশে নর্মদা নদীর তীরে অবস্থিত।

৫. অহল্যাবাই হোলকারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় অবদান কী?

১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে বারাণসীর কাশী বিশ্বনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণের পৃষ্ঠপোষকতা তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান।

৬. অহল্যাবাই হোলকার কবে মারা যান?

তিনি ১৩ আগস্ট, ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

৭. অহল্যাবাই হোলকারকে লোকমাতা বলা হয় কেন?

প্রজাদের কল্যাণে তাঁর উদ্যোগ, জনসাধারণের সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক স্থাপনা নির্মাণের জন্য তিনি ‘লোকমাতা’ নামে পরিচিত হন।

Leave a Comment