বৈদিক ও লৌকিক সংস্কৃত ভাষার পার্থক্য বা তুলনা মূলক আলোচনা
ভূমিকা
সংস্কৃত ভাষার মূল রূপ হল বৈদিক ভাষা। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বৈদিক ভাষা ক্রমে যে সুসংগঠিত রূপ লাভ করে, তাকেই লৌকিক বা ক্লাসিক্যাল সংস্কৃত বলা হয়।
ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে বৈদিক ভাষার দুটি স্তর লক্ষ করা যায়—
১. প্রাচীন বৈদিক
২. উত্তর বৈদিক
বৈদিক সাহিত্য মূলত ধর্মীয় সাহিত্য (শ্রুতি ও স্মৃতি)। পরে সংস্কৃত ভাষায় ধর্মীয় সাহিত্য ছাড়াও রাজপ্রশস্তি, লৌকিক সাহিত্য প্রভৃতি রচিত হয়।
পাণিনি (খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০ অব্দে) তাঁর বিখ্যাত ব্যাকরণগ্রন্থ অষ্টাধ্যায়ী রচনা করেন। তাঁর পূর্বে আর্যভাষার তিনটি প্রধান আঞ্চলিক রূপ ছিল—
১. প্রাচ্য (পূর্ব ভারত)
২. উদীচ্য (উত্তর-পশ্চিম ভারত)
৩. মধ্যদেশীয় (মধ্য ভারত)
ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, এ ছাড়া আরও একটি দক্ষিণাত্য রূপ ছিল।
পাণিনি মধ্যদেশীয় রূপকে ভিত্তি করে এবং অন্যান্য উপাদান সংযোজন করে সংস্কৃত ভাষার নিয়ম নির্ধারণ করেন। তাঁর সংস্কৃত ভাষাকেই সাধারণত ক্লাসিক্যাল বা লৌকিক সংস্কৃত বলা হয়।
বৈদিক ও লৌকিক সংস্কৃতের প্রধান পার্থক্য
পার্থক্য নির্ধারণের জন্য ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব ও অর্থতত্ত্ব বিচার করতে হয়।
১) ধ্বনিতাত্ত্বিক পার্থক্য
১. বৈদিক ভাষায় কিছু বিশেষ ধ্বনি ছিল যা লৌকিক সংস্কৃতে নেই।
২. বৈদিক ভাষায় ৯ ধ্বনি প্রচলিত ছিল, পরে অনেকগুলি লুপ্ত হয়।
৩. কিছু বর্ণের উচ্চারণ বিষয়ে মতভেদ ছিল।
৪. বৈদিক ভাষায় যৌগিক স্বর ও একক স্বর দুইভাবেই উচ্চারিত হত; লৌকিকে একরূপ।
৫. কিছু প্রাচীন ধ্বনি পরে পরিবর্তিত হয়েছে।
৬. মূর্ধন্যীকরণ বৈদিকে বেশি, লৌকিকে কম।
৭. বৈদিকে স্বরাঘাত অর্থ পরিবর্তন করত; লৌকিকে স্বরাঘাতের ভূমিকা নেই।
৮. বৈদিকে পদপাঠ ছিল; লৌকিকে নেই।
৯. বৈদিকে প্রধান ছন্দ ছিল ৭টি— গায়ত্রী, উষ্ণিক, অনুষ্টুপ, বৃত্তী, পংক্তি, ত্রিষ্টুপ, জগতি। লৌকিকে বিভিন্ন নতুন ছন্দ দেখা যায়।
১০. বৈদিক সন্ধি ছিল সহজ; লৌকিক সন্ধি কঠোর ও নিয়মবদ্ধ।
২) রূপতাত্ত্বিক পার্থক্য
(ক) শব্দরূপ
বৈদিকে বিভক্তির বিকল্প রূপ বেশি ছিল।
যেমন— ‘নর’ শব্দের প্রথমা ও দ্বিতীয়া বিভক্তিতে বৈদিকে একাধিক রূপ ছিল, লৌকিকে একটি।
(খ) সর্বনাম
বৈদিকে বহু বিকল্প রূপ ছিল।
কিছু সর্বনাম লৌকিকে লুপ্ত হয়েছে।
(গ) ধাতুরূপ
বৈদিকে ক্রিয়ার পাঁচটি কাল ছিল—
১. লট্ (বর্তমান)
২. লৃট্ (ভবিষ্যৎ)
৩. লঙ্ (অসমাপ্ত অতীত)
৪. লিট্ (সম্পূর্ণ অতীত)
৫. লুঙ্ (অতীত বিশেষ রূপ)
লৌকিকে কালের সংখ্যা কমে যায়।
(ঘ) ভাব
বৈদিকে পাঁচ প্রকার ভাব ছিল—
১. নির্দেশক
২. অনুজ্ঞা
৩. অভিপ্রায়
৪. সম্ভাবক
৫. নিষেধ
লৌকিকে প্রধানত দুটি— অনুজ্ঞা ও সম্ভাবক।
(ঙ) উপসর্গ
বৈদিকে উপসর্গ ক্রিয়ার আগে বা পরে স্বাধীনভাবে বসতে পারত।
লৌকিকে উপসর্গ ক্রিয়ার পূর্বে যুক্ত হয়ে বসে।
(চ) সমাস
বৈদিকে দীর্ঘ সমাস কম।
লৌকিকে দীর্ঘ ও বহু-পদবিশিষ্ট সমাস বেশি।
৩) শব্দভাণ্ডারগত পার্থক্য
বৈদিক ভাষার বহু শব্দ পরে লুপ্ত হয়েছে।
অনেক শব্দের অর্থ পরিবর্তিত হয়েছে।
উপসংহার
বৈদিক ও লৌকিক সংস্কৃত একই ভাষার দুটি ভিন্ন পর্যায়।
বৈদিক ভাষা প্রাচীন ও স্বতঃস্ফূর্ত; লৌকিক সংস্কৃত নিয়মবদ্ধ ও ব্যাকরণসংহত।