উচ্চ মাধ্যমিক একাদশ শ্রেণীর ইতিহাস ষষ্ঠ অধ্যায় ‘সমাজের ঘটনা প্রবাহ’ থেকে প্রাচীন ভারতে বর্ণ ও জাতি প্রথা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করো।
প্রাচীন ভারতে বর্ণ ও জাতি প্রথা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করো
প্রশ্ন:- প্রাচীন ভারতে বর্ণ ও জাতি প্রথা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করো।
ভূমিকা :- আর্যরা ছিল ফর্সা, অন্যদিকে অনার্যদের গায়ের রঙ ছিল কালো। এই ব্যবধানকে স্থায়ী করার উদ্দেশ্যে আর্যরা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করে। এইভাবে সমাজে বর্ণ প্রথার উদ্ভব ঘটে। এই প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ রাপসন বলেন যে, আর্য সমাজে ‘বর্ণ’ শব্দটি গায়ের রঙ অর্থাৎ আর্যরা গৌরবর্ণ ও অনার্যরা কৃষ্ণবর্ণ এই পার্থক্য বোঝাতে ‘বর্ণ’ প্রথার উদ্ভব। তবে এই ‘বর্ণ’ প্রথাই পরবর্তীকালে সমাজে জাতি প্রথার ভিত্তিভূমি রচনা করে।
চতুর্বর্ণ
বর্ণ বলতে বৈদিক সমাজের চতুর্বর্ণকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারটি বর্ণে বিভক্ত বৈদিক সমাজকে চতুর্বর্ণ বলা হয়।
চতুর্বর্ণের উৎপত্তি
চতুর্বর্ণের উৎপত্তি প্রসঙ্গে ঋগবেদের পুরুষসূক্তে বলা হয়েছে, আদি পুরুষ ব্রহ্মার মুখমণ্ডল থেকে ব্রাহ্মণ, বাহুদ্বয় থেকে ক্ষত্রিয়, উরুদেশ থেকে বৈশ্য এবং চরণযুগল থেকে শূদ্রের উৎপত্তি। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক শ্যামাচরণ দুবে মন্তব্য করেন যে, চতুর্বর্ণের উৎপত্তি সংক্রান্ত এই ব্যাখ্যা চারটি বর্ণের সামাজিক অবস্থানের প্রতীক হিসাবে পরিগণিত হতে পারে।
চতুর্বর্ণের কর্মবিভাজন
বেদে চতুর্বর্ণের কর্মবিভাজন সম্পর্কে উল্লেখ আছে। ব্রাহ্মণরা যাগযজ্ঞ, পূজার্চনা ও অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ক্ষত্রিয়দের কাজ ছিল দেশ রক্ষা ও শাসন করা। বৈশ্যরা ব্যবাসাবাণিজ্য ও কৃষিকাজ এবং শূদ্ররা উপরোক্ত তিনটি শ্রেণির সেবা করত বা ভৃত্যের কাজ করত। সমাজের প্রথম তিনটি শ্রেণিতে এদের অবস্থানের কারণে এবং কাজের গুরুত্বের বিচারে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা উপবীত ধারণ করতেন। এজন্য তাঁরা ‘দ্বিজ’ নামে পরিচিত ছিলেন।
মুক্ত সমাজের অস্তিত্ব
বৈদিক সমাজ চারটি বর্ণে বিভক্ত হলেও সমাজে উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ ছিল না। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক বটোমোর মন্তব্য করেন যে, এক বর্ণ থেকে অন্য বর্ণে যাওয়ার সুযোগ সকলেরই ছিল। নিম্নবর্ণের কোনো ব্যক্তি তার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারলে উচ্চ বর্ণে উন্নীত হতে পারত। এমনকি সমাজে অসবর্ণ বিবাহও প্রচলিত ছিল। তবে এই চতুর্বর্ণের পাশাপাশি মুচি, মেথর প্রভৃতি নীচু সম্প্রদায়গুলিকে নিয়ে পঞ্চম শ্রেণি নামে একটি শ্রেণির অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়।
বর্ণ থেকে জাতির উদ্ভব
ডঃ এ. এল. বাসাম মনে করেন যে, বৈদিক যুগে বর্ণ বলতে কোনো জাতিকে বোঝাত না। বর্ণ ও জাতি দুটি পৃথক সত্তা। কিন্তু তা সত্ত্বেও বর্ণ ও জাতি প্রথার মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। যার ফলে বৈদিক যুগের পরবর্তীকালে নতুন নতুন পেশার সৃষ্টি হলে পুরোনো বর্ণভিত্তিক জনগোষ্ঠীগুলি থেকে নতুন নতুন জনগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে।
‘জাতি’ সম্পর্কে ধারণা
ঐতিহাসিক ডি. ডি. কোশাম্বী মনে করেন যে, বৈদিক যুগে উপজাতিগুলির মধ্যে জাতিবৈষম্য না থাকলেও পরবর্তীকালে উপজাতিগুলি ভেঙে পড়তেথাকে এবং জাতিভেদ প্রথার জন্ম দেয়। তাই বলা যায় যে, ঋগবৈদিক যুগের বর্ণ প্রথা বিবর্তনের মাধ্যমে পরবর্তী বৈদিক যুগে জাতিভেদ প্রথায় পরিণত হয়।
জাতি ব্যবস্থার বিবর্তন
জাতি ব্যবস্থার উৎপত্তির পর থেকেভারতের জাতি ব্যবস্থা বিভিন্ন যুগের মধ্যে দিয়ে বিবর্তিতহয়েছে।যেমন –
(১) ঋগ্বৈদিক যুগ
বৈদিক যুগের সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চার শ্রেণিতে বিভক্ত হওয়াটা কোনো জাতিগত নয়। এটি ছিল বর্ণগত। কারণ বর্ণপ্রথা বংশানুক্রমিক যেমন ছিল না, তেমনি বর্ণ পরিবর্তনেও কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। তবে ঐতিহাসিক কোশাম্বী মনে করেন যে, পরবর্তীকালে উপজাতিগুলি যখন ভাঙতে শুরু করে তখনই জাতিভেদ প্রথার উদ্ভব ঘটে।
(২) পরবর্তী বৈদিক যুগ
পরবর্তী বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের রীতি-নীতি ও ধর্মবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সমাজে জাতিভেদ প্রথার উদ্ভব ঘটে। ব্রাত্য ও নিষাদ নামে দুটি অস্পৃশ্য জাতি গোষ্ঠীর উদ্ভব এই সত্যতাকে প্রমাণিত করে।
(৩) প্রতিবাদী ধর্মের যুগ
প্রতিবাদী ধর্মের যুগে বর্ণব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে জাতিব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়। বৌদ্ধ গ্রন্থগুলিতে চতুর্বর্ণের সঙ্গে অন্ত্যজ, দাস-ও অন্যান্য হীনজাতির কথা বলা হয়েছে।যাদের সঙ্গে সমাজের অভিজাত শ্রেণির বৈবাহিক বা পান ভোজনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধানিষেধ আরোপিত হয়েছিল।
(৪) মৌর্যযুগ
মৌর্যযুগে ভারতীয় জাতিব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন আসে। চারটি বর্ণের জায়গায় কতকগুলি পেশাগত জাতির উত্থান ঘটে। গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস তাঁর বর্ণনায় ভারতীয় সমাজে সাতটি জাতির অস্তিত্বের কথা বলেছেন এবং ভারতীয় সমাজকে কতকগুলি জাতি বা শ্রেণির সমাহার হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
(৫) পরবর্তী মৌর্যযুগ
পরবর্তী মৌর্য যুগে বিভিন্ন স্বাধীন ও স্বতন্ত্র জাতির যেমন উত্থান ঘটে, তেমনি শক, গ্রিক, কৃষাণ প্রভৃতি বিদেশি জাতিগুলি ভারতে প্রবেশ করে এবং ভারতীয় সমাজের সঙ্গে মিশে যায়। ফলশ্রুতি হিসাবে জাতিব্যবস্থার প্রাবল্য ও ভেদাভেদ বৃদ্ধি পায়।
(৬) গুপ্তযুগ
গুপ্তযুগে ব্রাহ্মণ্যবাদ যেমন জাতিগত ধর্মে পরিণত হয়, তেমনি সমাজে ব্রাহ্মণ্য জাতির প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। তবে সমাজে অসবর্ণ বিবাহ প্রচলিত থাকায়, নানান মিশ্রজাতির সৃষ্টি হতে থাকে। এদের মধ্যে চণ্ডালরা ছিল সর্বাধিক অবহেলিত। হর্ষবর্ধন এবং তাঁরও পরবর্তীকালে ভারতীয় সমাজে জাতিব্যবস্থা একইরকম অপরিবর্তিত থাকে।
উপসংহার :- পরিশেষে বলা যায় যে, প্রাচীন ভারতীয় জাতিব্যবস্থায় ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য এবং শূদ্রদের অবনমন ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে। তবে পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ মধ্যযুগে জাতিগত বৈষম্য ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে।