ভারতের কৃষকদের বৈপ্লবিক সংগ্ৰাম প্রসঙ্গে ভারতের বিভিন্ন স্থানে কৃষক অভ্যুত্থান, ভারতে কৃষকরাজ প্রতিষ্ঠা, ভারতের ইতিহাসে এক বিশেষ বৈপ্লবিক কাল, কৃষক সংগ্ৰামের ঝড়, ভারতে উন্নততর বৈপ্লবিক সংগ্রামের যুগ, নিখিল ভারত কৃষক সভা গঠন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কৃষক-সংগ্রাম ও তেলেঙ্গানার কৃষক সংগ্ৰাম সম্পর্কে জানবো।
ভারতের কৃষকদের বৈপ্লবিক সংগ্ৰাম
ঐতিহাসিক ঘটনা | ভারতের কৃষকদের বৈপ্লবিক সংগ্রাম |
খিলাফৎ আন্দোলন | ১৯২০ খ্রি: |
কৃষক রাজ প্রতিষ্ঠা | ১৯২০-২১ খ্রি: |
বারদৌলি বিদ্রোহ | ১৯২৮ খ্রি: |
নিখিল ভারত কৃষক সভা | ১৯৩৬ খ্রি: |
ভারত ছাড়ো আন্দোলন | ১৯৪২ খ্রি: |
ভূমিকা :- প্রত্যেক বারের ব্যাপক শ্রমিক-সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে সামন্ততান্ত্রিক শোষণ-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে কৃষক সম্প্রদায়ের সংগ্রাম এবং সংগ্রামের ক্ষেত্রে শ্রমিকশ্রেণীর সাথে কৃষকের মিলন ভারত-এর বৈপ্লবিক সংগ্রামের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ভারতের বিভিন্ন স্থানে কৃষক অভ্যুত্থান
১৯০৭-০৮ সালে যেমন পাঞ্জাব ও মাদ্রাজে শ্রমিকশ্রেণীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের মিলিত সংগ্রাম হয়, তেমনই ১৯১৮-১৯ সাল থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত ভারতব্যাপী শ্রমিক-সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে ‘খিলাফত আন্দোলন’-এর অঙ্গ হিসাবে বিভিন্ন স্থানে কারিগরশ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষক-অভ্যুত্থান, শ্রমিক শ্রেণীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে পাঞ্জাবে কৃষক-অভ্যুত্থান, পাঞ্জাবের গুজরানওয়ালা অভ্যুত্থান ঘটে।
ভারতে কৃষকরাজ প্রতিষ্ঠা
১৯২০-২১ সালে জাতীয় আন্দোলনের অংশ হিসাবে শ্রমিক-সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে পাঞ্জাবে কৃষক-অভ্যূত্থান, মালাবারে মোপলা কৃষকদের পঞ্চম অভ্যুত্থান এবং কারিগরশ্রেণীর নেতৃত্বে তিনটি জেলায় কৃষক-রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভারতের ইতিহাসে এক বিশেষ বৈপ্লবিক কাল
১৯২১-২২ সালে যুক্ত প্রদেশে (বর্তমান উত্তর প্রদেশে) শহরাঞ্চলের শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে অযোধ্যা, বেরিলি ও গোরক্ষপুর জেলায় ‘চৌরিচৌরা-বিদ্রোহ’ প্রভৃতি কৃষক-অভ্যুত্থান এবং লক্ষ্ণৌ ও পাঞ্জাবের মুলতান জেলার ও বঙ্গদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক-জনসাধারণের ব্যাপক অভ্যুত্থান ১৯১৮ সাল থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত সময়কে ভারতের ইতিহাসে এক বিশেষ বৈপ্লবিক কাল রূপে চিহ্নিত করে রেখেছে।
ভারতে কৃষক-সংগ্রামের ঝড়
এর পর থেকে এই বৈপ্লবিক সংগ্রাম আর এক উন্নততর পর্যায়ে আরোহণ করেছে। এই পর্যায়ে ভারতবর্ষের উপর দিয়ে শ্রমিক-সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে কৃষক-সংগ্রামেরও ঝড় বয়ে গেছে।
ভারতে উন্নততর বৈপ্লবিক সংগ্রামের যুগ
- (১) ১৯২৮ সালে গুজরাট প্রদেশের বারদৌলি-বিদ্রোহ, ১৯৩০ সালে ভারতের জাতীয় সংগ্রামের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসাবে শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সামন্ততান্ত্রিক শোষণ-উৎপীড়নের অবসান ও স্বাধীনতার দাবিতে কৃষক-অভ্যুত্থান ঘটে।
- (২) ১৯৩০ সালে পেশোয়ারে শ্রমিকশ্রেণীর সাথে একযোগে কৃষক অভ্যূত্থান ও শ্রমিক-কৃষক রাজের প্রতিষ্ঠা, বঙ্গদেশে কিশোরগঞ্জ বিদ্রোহ, উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ ও অযোধ্যা জেলায় কৃষকের রাজনীতিক সংগ্রাম হিসাবে সরকারী কর-বন্ধের সংগ্রাম, মধ্যপ্রদেশের বেরীর ও ফুলদানা জেলায় কৃষি-শ্রমিকদের নেতৃত্বে কৃষক-অভ্যুত্থান, বুলদানা জেলায় মহাজন-বিরোধী কৃষক-অভ্যুত্থান ঘটে।
- (৩) উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে উপজাতীয় কৃষকদের অভ্যুত্থান, ১৯৩১ সালে উত্তর প্রদেশের কৃষক অভ্যুত্থান এবং ১৯৩১-৩৩ সালে অন্ধ্র প্রদেশে কৃষক-সম্প্রদায়ের সামন্ততান্ত্রিক শোষণ-বিরোধী সংগ্রামের সাথে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রাম, ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৩২-৩৩ সাল পর্যন্ত সময়কে উন্নততর বৈপ্লবিক সংগ্রামের যুগরূপে চিহ্নিত করে রেখেছে।
নিখিল ভারত কৃষক-সভা গঠন
বৈপ্লবিক সংগ্রামের পরবর্তী কাল ভারতব্যাপী সংগঠিত কৃষক-সংগ্রামের কাল। শ্রমিকশ্রেণীর সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের অনুসরণে ১৯৩৬ সালে ‘নিখিল ভারত কৃষক-সভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহার পর হইতে আরম্ভ হয় কেন্দ্রীয় পরিচালনায় সংগঠিত কৃষক সংগ্রাম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কৃষক-সংগ্রাম
১৯৩৭ সালে শ্রমিক-সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে বিহারে আরম্ভ হয় কৃষক আন্দোলন, উত্তর প্রদেশ, বোম্বাই, কেরালা ও বঙ্গদেশে ব্যাপক কৃষক-সংগ্রাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-এর সময় কৃষক-সংগ্রাম আর এক উন্নততর স্তরে আরোহণ করে।
আগস্ট-আন্দোলনের সময় কৃষক সংগ্ৰাম
১৯৪২ সালের ‘আগস্ট-আন্দোলন’-এ বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক-সম্প্রদায় স্বাধীনতার জন্য সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। তারা সাতারা, বালিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কৃষক সংগ্ৰাম
- (১) দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসানে শ্রমিক-সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বঙ্গদেশে তেভাগার দাবিতে প্রায় ৫০ লক্ষ ভাগচাষীর ঐতিহাসিক সংগ্রাম, টক-প্রথার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের হাজং-বিদ্রোহ, পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ ও বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক-বিদ্রোহ, বোম্বাইয়ের কর্নাটক জেলায় কৃষক-সংগ্রাম সংঘটিত হয়।
- (২) এরপর উত্তর মালাবারের কৃষকদের জমিদার-মহাজন-মজুদদার-বিরোধী সংগ্রাম, গুজরাটে ও আসামের সুরমা উপত্যকায় ভাগচাষীদের সংগ্রাম, পাঞ্জাবের অমৃতসর, মন্টোগোমারি ও অন্যান্য জেলায় কৃষকদের সংগ্রাম, উড়িষ্যার চারটি জেলায় ভাগচাষীদের সংগ্রাম শুরু হয়।
- (৩) মহারাষ্ট্রে ভূমিদাস-প্রথা ও বেগার প্রথার বিরুদ্ধে এবং মজুরি বৃদ্ধির জন্য ওয়ার্দি কৃষকের সংগ্রাম, মাদ্রাজের কৃষ্ণা জেলার কৃষকের সংগ্রাম, বিহারের এগারোটি জেলায় কৃষকের সংগ্রাম প্রভৃতি নূতন ইতিহাস রচনা করে। এই সংগ্রামের প্রত্যেকটি ছিল দৃঢ়তায় ও জঙ্গী চরিত্রে অভূতপূর্ব এবং এই সংগ্রামগুলি পরবর্তী কালের বহুগুণ উন্নত বৈপ্লবিক সংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রাখে ।
তেলেঙ্গানার কৃষক সংগ্ৰাম
- (১) পরবর্তী কাল আরও উন্নত স্তরের বৈপ্লবিক সংগ্রামের কাল, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কাল। প্রথম জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব হিসাবে ‘তেলেঙ্গানা বিপ্লব’ ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাসে বিপ্লবী জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুগের উদ্বোধন করেছে।
- (২) ১৯৪৬ সালে (ব্রিটিশ শাসনকালে) আর্থনীতিক দাবি লইয়া তেলেঙ্গানা-সংগ্রামের আরম্ভ, শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে ভারতের সামন্ততন্ত্র-এর প্রধান স্তম্ভস্বরূপ হায়দরাবাদের নিজামশাহীর ধ্বংস সাধনের উদ্দেশ্যে বৈপ্লবিক সংগ্রামের স্তরে এই সংগ্রামের উত্তরণ।
উপসংহার :- আড়াই হাজার গ্রামব্যাপী বিশাল অঞ্চলে নিজামশাহীর ধ্বংস সাধন ও জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা – আজ পর্যন্ত ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাসের বৃহত্তম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনারূপে জাজ্জ্বল্যমান।
(FAQ) ভারতের কৃষকদের বৈপ্লবিক সংগ্ৰাম সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে।
১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে।
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে।
১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে।