চিনে বক্সার বিদ্রোহ প্রসঙ্গে আই হো চুয়ান, বিদেশি বিরোধী অভ্যুত্থান বক্সার বিদ্রোহ, বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি, বক্সারদের উৎপত্তি, বক্সার বিদ্রোহের প্রকৃতি, বক্সার বিদ্রোহের সূচনা ও বিস্তার, বক্সার বিদ্রোহ দমন, বক্সার বিদ্রোহের ব্যর্থতা ও বক্সার প্রোটোকল সম্পর্কে জানবো।
সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বক্সার বিদ্রোহ প্রসঙ্গে চীনে বক্সারদের উৎপত্তি, বক্সার বিদ্রোহের কারণ ও পরিণতি, বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি, বক্সার বিদ্রোহের নীতি, বক্সার বিদ্রোহের সময়কাল, বক্সার বিদ্রোহের সূচনা, বক্সার বিদ্রোহের প্রকৃতি, বক্সার বিদ্রোহের বিস্তার, বক্সার বিদ্রোহ দমন, বক্সার বিদ্রোহের ব্যর্থতা ও বক্সার প্রোটোকল স্বাক্ষর সম্পর্কে জানব।
বক্সার বিদ্রোহ
| ঐতিহাসিক ঘটনা | বক্সার বিদ্রোহ |
| অন্য নাম | আই হো চুয়ান |
| দেশ | চীন |
| সময়কাল | ১৮৯৯-১৯০১ খ্রি |
| ফলাফল | ব্যর্থতা |
| বক্সার প্রোটোকল | ১৯০১ খ্রি |
ভূমিকা :- চিনের সংস্কার আন্দোলন ব্যর্থ হবার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই চিন এক ব্যাপক ও জঙ্গী গণবিদ্রোহের সম্মুখীন হয়েছিল। এই গণ-অভ্যুত্থানই চিনের ইতিহাসে বিখ্যাত বক্সার বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
আই হো চুয়ান
ঊনবিংশ শতকের অন্তিম লগ্নে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক পর্বে বক্সার বিদ্রোহীরা চিনে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে এক তীব্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন। চিনে এই বিদ্রোহ আই হো চুয়ান নামে পরিচিত। বিদেশিরা বিদ্রোহীদের ‘বক্সার’ নামে আখ্যায়িত করেছিলেন।
বিদেশি বিরোধী অভ্যুত্থান বক্সার বিদ্রোহ
ঐতিহাসিকেরা একটি বিষয়ে মোটামুটি সুনিশ্চিত যে, বক্সার বিদ্রোহ ছিল মূলত বিদেশি-বিরোধী অভ্যুত্থান। বিদ্রোহীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদেশিদের চীন থেকে বিতাড়িত করে চিনের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
চীনে বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি
- (১) আফিম যুদ্ধে চিনের পরাজয়ের পর থেকেই চিনে বিদেশি শক্তি নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের হস্তক্ষেপ এবং অর্ধশতাব্দী ধরে বিদেশিদের সদম্ভ উপস্থিতি চিনের মানুষকে পীড়িত করেছিল।
- (২) সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ চিনে যে নির্লজ্জ লুণ্ঠনের নীতি গ্রহণ করেছিল তারই প্রতিক্রিয়া হিসাবে চিনের অর্থনীতি মারাত্মক রকমের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বদমেজাজি বিদেশি মন্ত্রী ও কনসালেরা এবং আগ্রাসী খ্রিস্টান মিশনারিরা প্রায়ই চিনের সাধারণ মানুষদের সাথে দুর্ব্যবহার করতেন, ফলে চিনাদের জাতীয়তাবাদী দম্ভ এবং আত্মমর্যাদা আহত হয়েছিল।
- (৩) স্বাভাবিকভাবেই চিনারা বিদেশিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে উঠেছিলেন এবং বিদেশিদের বিরুদ্ধে তাঁদের রোষ ধূমায়িত হয়ে উঠেছিল। এই পটভূমিকার সাথে অবশ্যই যুক্ত হয়েছিল কতকগুলি সামাজিক, রাজনৈতিক, ও ধর্মীয় কারণ এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে চীনে বক্সার বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল।
- (৪) বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা গুলি হল খ্রিস্টধর্মের প্রতি বিদ্বেষ, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনরোষ, চিনের জনজীবনে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কৃষির সংকট, চিন-জাপান যুদ্ধের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া প্রভৃতি।
বক্সারদের উৎপত্তি
এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –
(১) আই হো চুয়ান সমিতি গঠন
চিয়া চিং যুগে (১৭৯৬-১৮২০ খ্রিঃ) এইট ট্রায়াগ্রাম সেক্ট নামে গুপ্ত সমিতির মধ্যে বক্সারদের উৎপত্তি হয়েছিল। এইট ট্রায়াগ্রাম সেক্ট পা-কুয়া চিও নামে পরিচিত ছিল। পা-কুয়া চিও ছিল শ্বেতপদ্ম সমিতি নামে একটি মাঞ্চু-বিরোধী গুপ্ত সমিতির সাথে যুক্ত। পা-কুয়া চিওর ভেতরে আই হো চুয়ান নামে একটি গুপ্ত সমিতি গড়ে উঠেছিল। বহু বছর পর বিদেশিরা আই হো চুয়ানের সদস্যদের ‘বক্সার’ নামে আখ্যায়িত করেছিলেন।
(২) চীনে আই হো চুয়ান সমিতি সম্পর্কে সরকারি উল্লেখ
আই হো চুয়ান নামক সমিতির প্রথম সরকারি উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত একটি দলিলে। উক্ত সরকারি অনুশাসনে আই হো চুয়ান সদস্যদের “তরোয়ালধারী বদমাস” নামে আখ্যায়িত হয়েছিল।
(৩) আই হো চুয়ান সমিতিকে বেআইনি ঘোষণা
মাঞ্চু রাজতন্ত্রবিরোধী কার্যাবলীর জন্য এই সমিতিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ শানটুং, হুনান, কিয়াংসু ও চিহলি অঞ্চলে এই সংগঠন যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু তারপর এদের কার্যকলাপ স্তিমিত হয়ে আসে।
(৪) চীনের আই হো চুয়ান সমিতির বিদেশি বিরোধিতা
১৮৯০-এর দশকে আই হো চুয়ান আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে, কিন্তু সেই সময় এর সদস্যরা মাঞ্চু রাজবংশের বিরোধিতার পরিবর্তে উগ্র বিদেশি-বিরোধী হয়ে ওঠে। তারা বিদেশিদের ও তাদের চিনা সহযোগীদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
(৫) আই হো চুয়ান সমিতির নাম পরিবর্তন
এই সময়ে আই হো চুয়ানের কার্যকলাপকে শানটুং-এর রক্ষণশীল গভর্নর লি-পেং হেং যথেষ্ট মদত দিয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তী গভর্নর ইউ শিয়েনও তাদের উগ্র সমর্থক ছিলেন। তিনি আই হো চুয়ানের পরিবর্তে সমিতির নামকরণ করেছিলেন আই হো টুয়ান।
(৬) চীনে আই হো চুয়ান ও আই হো টুয়ান কথার অর্থ
আই হো চুয়ান কথাটির অর্থ ছিল ন্যায়পরায়ণ ও সমন্বয়পূর্ণ মুষ্টি বক্সার” কথাটি এর থেকেই এসেছিল। আই হো টুয়ান কথাটির অর্থ ছিল ন্যায়পরায়ণ ও সমন্বয়পূর্ণ স্থানীয় বাহিনী।
চীনে বক্সার বিদ্রোহের প্রকৃতি ও বক্সার প্রোটোকল
- (১) ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে জাপানের হাতে চিনের শোচনীয় পরাজয়, ১৮৯৭-৯৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বিভিন্ন পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কর্তৃক চীনের বিভাজন, চিনাদের প্রতি খ্রিস্টান মিশনারিদের দুর্ব্যবহার প্রভৃতি ঘটনার হিংস্র প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হয়েছিল ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের বক্সার বিদ্রোহের মধ্যে।
- (২) ঐতিহাসিক জ্যাক গ্রে বলেছেন, বক্সার বিদ্রোহীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদেশিদের চিন থেকে বিতাড়িত করা। ঐতিহাসিক জাঁ শ্যেনো বলেছেন, বক্সার অভ্যুত্থান ছিল চিনাদের একটি জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া এবং খ্রিস্টান মিশনারি ও ধর্মান্তরিত চিনা খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে জেহাদ ৷
- (৩) তাছাড়াও, শ্যেনো বলেছেন, এটি ছিল গুপ্ত সমিতির নেতৃত্বাধীন একটি কৃষক বিদ্রোহ। ফেয়ারব্যাঙ্কের মতে, চিনা জনজীবনে যে গভীর সংকট দেখা দিয়েছিল বক্সার বিদ্রোহ ছিল তার বিরুদ্ধে এক প্রত্যক্ষ সংগ্রাম (The Boxer movement emerged as a direct action response to a deepening crisis, in the lives of the whole Chinese people.)
বক্সার বিদ্রোহের সূচনা ও বিস্তার
- (১) শানটুং অঞ্চলে বক্সার বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল। তারপর এই বিদ্রোহ চীনের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে তিয়েনসিনে বক্সার এবং বিদেশি সৈন্যদের মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। বিদ্রোহীরা পিকিং এবং তিয়েনসিনের মধ্যে টেলিগ্রাফ যোগাযোগ ধ্বংস করে দেন।
- (২) ১০ জুন ব্রিটিশদের গ্রীষ্মকালীন দূতাবাসে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং জাপানি দূতাবাসের চ্যান্সেলর সুগিয়ামা বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন। ১৩ জুন বক্সাররা পিকিং-এ প্রবেশ করে গির্জা ও বিদেশি দূতাবাসগুলিতে আগুন ধরিয়ে দেন এবং বহু চিনা খ্রিস্টানকে হত্যা করেন। ২০ জুন পিকিং-এর রাজপথে জার্মান রাষ্ট্রদূত ক্লিমেন্স কেটেলার নিহত হলেন।
চীনে বক্সার বিদ্রোহ দমন
- (১) আটটি বিদেশি শক্তি পিকিং-এর অবরুদ্ধ বিদেশি দূতাবাসগুলির অবরোধ মুক্ত করার জন্য একটি যৌথ আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন করে। এই বাহিনী ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বক্সারদের পরাস্ত করে তিয়েনসিন দখল করে নেয়। তারপর এই বাহিনী আগস্ট মাসে বিদ্রোহীদের দমন করার উদ্দেশ্যে পিকিং অভিমুখে যাত্রা করে।
- (২) ১৪ আগস্টের মধ্যে বিদেশি সেনারা বিদ্রোহীদের সমস্ত অবরোধ ভেঙে ফেলে। বিদেশি দূতাবাসগুলিকে অবরোধমুক্ত করার পর বিদেশি সৈন্যবাহিনী পিকিং-এ ব্যাপক লুঠতরাজ এবং ধ্বংসলীলা চালায়। ১৫ আগস্ট বিধবা সম্রাজ্ঞী কয়েকজন সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে ছদ্মবেশে পিকিং ছেড়ে পালিয়ে যান।
বক্সার বিদ্রোহের ব্যর্থতা
- (১) চিনের বিধবা সম্রাজ্ঞী বক্সারদের সাহায্যে বিদেশিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে অবশ্যই বিদ্রোহীদের ক্ষতি হয়েছিল। কারণ চিনের সরকারি বাহিনীর নেতা জং লু বিদেশিদের প্রতি কখনোই ক্ষুব্ধ ছিলেন না। তাই দূতাবাসগুলির ওপর আক্রমণের সময় তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন নি।
- (২) তাছাড়া, দক্ষিণ-পূর্ব চিনের বিভিন্ন অঞ্চল অর্থাৎ উহান, ক্যান্টন এবং নানকিং-এ গভর্নরদের প্রচেষ্টায় বক্সার বিদ্রোহ দানা বেঁধে ওঠে নি। চীনের রক্ষণশীল বিধবা রানি এ সময়ে অত্যন্ত সুযোগসন্ধানী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। মাঞ্চু শাসনকে বিদ্রোহীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি বক্সারদের সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, একই সাথে তিনি বিদেশিদের জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাদের আক্রমণ করার কোনো পরিকল্পনাই মাঞ্চু সরকারের নেই।
বক্সার প্রোটোকল
চীনের পরাজয় এবং বক্সার বিদ্রোহের ব্যর্থতার পর বিদেশি শক্তিসমূহ চিনকে ১২টি শর্ত সম্বলিত একটি চুক্তির প্রস্তাব দেয় ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে ২৪ ডিসেম্বর। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে ৭ সেপ্টেম্বর চিন এবং ১১টি বিদেশি শক্তির মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি “বক্সার প্রোটোকল” নামে বিখ্যাত।
উপসংহার :- বক্সার প্রোটোকল যখন চীনের মর্যাদা হ্রাস করেছিল, তখন চিনের বুদ্ধিজীবী ও মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিকরা বৈপ্লবিক আন্দোলনের সমর্থক হতে আরম্ভ করেন। একজন রাজদ্রোহী থেকে সান ইয়াৎ সেন একজন দেশপ্রেমিক বিপ্লবীতে রূপান্তরিত হন। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী ঘটনাস্রোত চিনকে অনিবার্যভাবে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে নিয়ে যায়।
(FAQ) বক্সার বিদ্রোহ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?
চিনে।
১৮৯৯-১৯০১ খ্রিস্টাব্দ।
আই হো চুয়ান।
১৯০১ খ্রিস্টাব্দে।
অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি
- WBSSC Group C Question Paper 2026
- 3rd Semester Sanskrit Syllabus 2027
- প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার লক্ষ্য
- মুসলিম লীগ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত টীকা
- নেহেরু মহলানবিশ মডেল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত টীকা
- সিপাহী বিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ
- ভারতীয় সংবিধানের তিনটি বৈশিষ্ট্য
- HS 4th Semester History Question Paper 2026
- স্বর্ণ বীজ বপন করতে কেউ রাজি হল না কেন


